জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঢাকার আশুলিয়ায় গুলি করে ছয় তরুণকে হত্যার পর ভ্যানে স্তূপ করে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার সেই পৈশাচিক ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন আদালত। আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করবেন।
রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায়ের জন্য এই দিন নির্ধারণ করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এর আগে গত ২০ জানুয়ারি উভয় পক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (CAV) রাখা হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম যুক্তিখণ্ডন করেন এবং আসামিপক্ষে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মো. আমির হোসেন, মিরাজুল আলম ও আবুল হাসান যুক্তি উপস্থাপন করেন। প্রসিকিউশন পক্ষ এই মামলাটিকে ‘বিরল নৃশংসতা’ হিসেবে উল্লেখ করে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
এই মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ১৬ জন। বর্তমানে আটজন আসামি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন:মো. আব্দুল্লাহিল কাফী: সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস, ঢাকা জেলা), মো. শাহিদুল ইসলাম: সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল), আরাফাত হোসেন: সাবেক ডিবির পরিদর্শক। এছাড়া এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, এসআই শেখ আবজালুল হক ও কনস্টেবল মুকুল।
সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ বাকি ৮ জন আসামি এখনও পলাতক রয়েছেন। উল্লেখ্য, আটজন আসামির মধ্যে সাতজন নিজেদের নির্দোষ দাবি করলেও এসআই শেখ আবজালুল হক আদালতে দোষ স্বীকার করেছেন এবং রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে ৬ জন তরুণ শহীদ হন। এরপর পুলিশ ভ্যানে তাদের লাশ স্তূপ করে তোলা হয়। বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ভ্যানের লাশের ওপর পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এমনকি দগ্ধদের মধ্যে একজন তখনও জীবিত ছিলেন, কিন্তু তাকে বাঁচতে না দিয়ে নৃশংসভাবে পুড়িয়ে মারা হয়। এর আগের দিন আরও একজন একই ঘটনায় শহীদ হন, ফলে মামলায় মোট ৭ জন নিহতের কথা উল্লেখ রয়েছে।
১১ সেপ্টেম্বর দায়ের করা এই মামলায় গত বছরের ২১ আগস্ট অভিযোগ গঠন করা হয়। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে জমা দেওয়া ফরমাল চার্জে ৩১৩ পৃষ্ঠার তথ্যসূত্র, ৬২ জন সাক্ষী, ১৬৮ পৃষ্ঠার দালিলিক প্রমাণ এবং দুটি পেনড্রাইভে ভিডিও ফুটেজসহ অকাট্য প্রমাণাদি যুক্ত করা হয়েছে।
৫ ফেব্রুয়ারির এই রায়কে কেন্দ্র করে নিহতদের পরিবার এবং ছাত্র-জনতার মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। জনমনে প্রত্যাশা, এই রায়ের মাধ্যমে মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত সেই বর্বরোচিত অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।