সরকারে যাবে কারা, কোন দল?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুখবর বয়ে আনছে কাদের জন্য? কারা গঠন করবে আগামী সরকার? বিএনপি, জামায়াত নাকি কোয়ালিশন? গত সপ্তাহে গিয়েছিলাম টাঙ্গাইলের কুইচতার গ্রামে। ভারি সুন্দর, শহর থেকে দূরের একটি গ্রাম, ছায়া সুনিবিড়। এখানে বসতি বিরল। আদিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ। শীতকালে প্রসারিত মাঠ ভরে উঠেছে শস্যের হলুদে। বাতাসে ভুরভুর ঘ্রাণ। কুইচতার গ্রামে হিন্দু ও মুসলমান বসবাস করে পাশাপাশি। ঘোষ, মণ্ডল, সূত্রধর, সৈয়দ, খান কী চৌধুরী থাকে পাশাপাশি। সেই গ্রামের মেঠোপথের পাশে চায়ের টং দোকানের সামনে মাচায় বসে চা খেতে খেতে কথা হলো বেশ কয়েকজন প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে।

প্রসঙ্গ হালফিল রাজনীতি ও নির্বাচন। আলাপ করে সামনের নির্বাচন নিয়ে তারা কী ভাবছেন, সে সম্পর্কে একটা আভাস পাওয়া গেল। কী সে আভাস? ডিটেইলসে পরে আসছি। তার আগে শিল্প-সাহিত্যের শহর ময়মনসিংহ ও এই জেলার তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা একটি গ্রাম এবং চরের মানুষের অনেকের এই সময়ের রাজনৈতিক ভাবনার সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ হয়েছিল। ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের ডাকে আমার যাওয়া হয়েছিল ওই শহরে। ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ বেশ পুরোনো সংগঠন। আশির দশকে দেখেছি এই সংসদ শীতের মৌসুমে প্রতি বছর সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করত। ঢাকা থেকে ডাকসাইটে কবিদের নিমন্ত্রণ করে নেওয়া হতো। সেই উৎসবে ময়মনসিংহের কবি-সাহিত্যিকদেও চেয়ে ঢাকার কবিরাই বেশি আনন্দ উপভোগ করতেন। বীক্ষণ নামে তাদের একটা স্টাডি সার্কেলও ছিল এবং এখনো আছে।

ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ নানান প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও এখন আরও বেশি কর্মমুখর হয়ে উঠেছে। সংসদ এখন আরও বেশি করে ময়মনসিংহের হয়ে উঠতে চাইছে। অন্যরকম একটা সাহিত্যিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছে। জেলার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নবীন সাহিত্যকর্মীদের এগিয়ে দিতে তারা কবিতার কর্মশালার আয়োজন করেছিল। কয়েক দিন আগে কবিতা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। সামাজিক মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের আপ্লুত পোস্টের ছড়াছড়ি দেখে বুঝলাম, উৎসবটি জমে উঠেছিল খুব। ভরে উঠেছিল প্রাণের প্রাচুর্যে।

বোধগম্য কারণেই ময়মনসিংহের লেখক, কবি ও সাহিত্যসেবীরা সমাজ ও রাজনীতির বিষয়ে সমান সচেতন। নিজেরা সরাসরি কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না হলেও পর্যবেক্ষক হিসেবে, আমার কাছে মনে হয়েছে, তাদের দৃষ্টি তীক্ষè ও গভীর। তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে যা পেলাম তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। একই রকমভাবে এই জেলার গ্রাম ও চরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখলাম মতপ্রকাশে কমবেশি সবাই রক্ষণশীল। রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলতে একটা ভয় ও অবিশ্বাস সবার মধ্যেই কাজ করে। তারপরও আলাপ করে যতটুকু বুঝতে পেরেছি, এবারের ইলেকশনের ফলাফল কেমন হবে তার ফোরকাস্ট করা মোটেও সহজ নয়। নিকট ও দূর অতীতের কৃতকর্মের খেসারত দিতে হতে পারে ওভার কনফিডেন্ট দলগুলোকেও।

কারা সরকার গঠন করবে, এরকম প্রশ্ন যখন সামনে আসে তখন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীই বেশি প্রাসঙ্গিক। হাতপাখা নিয়েও আলোচনা হয়। কিন্তু এই মার্কার দলটি সরকার গঠন করবে-এমন ভাবার সুযোগ নেই। তবে কোয়ালিশন হলে অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এবারের নির্বাচনে ভোটারদের মার্কা ও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় আসবে, তার ধারণা পাওয়া যায় নানা মত ও শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলে। দূর ও নিকট অতীতের কৃতকর্মের ফল ব্যালটে কমবেশি প্রতিফলিত হবে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কার কতটুকু অবদান তা নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকলেও এবার মুক্তিযুদ্ধ বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। ২০২৪ সালের ৩৬ দিনের গণ আন্দোলন দিয়ে ২৩ বছরের স্বাধিকার ও স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মেনে নিতে চাইবেন না, এই স্বাভাবিক। আরেকটি তরতাজা ইস্যু হচ্ছে চাঁদাবাজি। তৃণমূল পর্যায়ে ফ্যাসিস্টের দোসর খুঁজতে গিয়ে যারা নিরপরাধ মানুষের ওপর অত্যাচার করেছে, মব করেছে সেটাও অনেকের মনে থাকবে। তারপরও মানতে হবে যে সাংগঠনিক শক্তি এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নেতৃত্বের গুণে অনেক বিচ্যুতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

এবারের ভোটে আলোচনায় রয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী, বলেছি আগেই। এক্ষণে জনগণের সাধারণ ধারণার আলোকে এই দুটো দলের ভালো ও মন্দ দিকগুলো নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা যায় বৈকি। প্রথমেই আসা যাক বিএনপির কথায়। ইলেকশনের মাঠে যখন আওয়ামী লীগ নেই, তখন কোনো সন্দেহ নেই যে বিএনপি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগ মাঠে থাকতেও বিএনপি-লীগ ছিল নেক টু নেক। বলা যায়, সমানে সমান। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আবেগ ও ভালোবাসায় জায়গাটা খুবই মজবুত। দলের বর্তমান চেয়ারম্যানের ক্যারিশমেটিক বা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নেতৃত্ব দলকে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে। প্রায় প্রতিটি আসনে ধানের শীষের প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন বলে বিভিন্ন জরিপে প্রকাশ। দলটির বড় সমস্যা হলো সাংগঠনিক শৃঙ্খলার অভাব। তৃণমূল পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের ওপরে দলীয় নেতৃত্বের কমান্ড অনেক ক্ষেত্রে কাজ করছে না। দলের মনোনয়ন না পেয়ে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন তারা কোনো কোনো আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন। এটা প্রতিপক্ষের জন্য লাভজনক হবে। ইলেকশন বৈতরণি পার হওয়া তাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে।

বিএনপির আরও একটি ব্ল্যাকস্পট হচ্ছে চাঁদাবাজির বদনাম। ৫ আগস্টের পর যদিও চাঁদাবাজিতে কোনো দলই পিছিয়ে ছিল না, তথাপি বেশি বদনাম হয়েছে বিএনপির। বড় গাছে বাতাস বেশি লাগে। এমতাবস্থায় বিএনপির ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বকে সব পর্যায়ে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। চাঁদাবাজি শব্দটি উহ্য রেখে আইনের শাসন, নিরাপদ জীবন, দুর্নীতি দমন বলে পাশ কাটিয়ে গেলে লোকের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছার আশঙ্কা থাকে। কেননা সব চাঁদাবাজি দুর্নীতির মধ্যে পড়ে কিনা, ফৌজদারি অপরাধ কিনা, এর মধ্যে ওকালতি প্যাঁচের সুযোগ রয়েছে। আরেকটা কথা, চাঁদাবাজরাও নিরাপদে বসবাস বা ব্যবসার সুযোগ করে দেবে বলেই খরচাপাতি দাবি করে থাকে। কাজেই চাঁদাবাজি বন্ধ করার স্পষ্ট ঘোষণা দরকার।

বিএনপির আকর্ষণীয় দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে দলটির গণমুখী পরিকল্পনা। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, আনন্দময় প্রাইমারি শিক্ষার পরিকল্পনা, টেকনিক্যাল শিক্ষার প্রসার, খালকাটা কর্মসূচি ইত্যাদি বেশ সাড়া জাগিয়েছে। আশা করি ১২ তারিখের নির্বাচনে বিএনপি এসবের সুফল পাবে।

পক্ষান্তরে জনসমর্থনের দিক দিয়ে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির তুলনায় ছোট হলেও অনেক বেশি সংগঠিত। এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ দল। নেতা-কর্মীদের ওপর কমান্ড রয়েছে তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু এই দলটি মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ বলে যে বদনাম রয়েছে, সেটা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বরং কোনো কোনো নেতা এখনো মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে বিষোদগার করে চলেছেন। ৫৪ বছরের প্রতিশোধ নিতে চাইছেন, কেউ কেউ ভোটের বিনিময়ে জান্নাত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এগুলো দলটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

আশা করি দুই প্রধান দল তাদের ত্রুটিগুলো সংশোধন করবে। নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন সহিংস ঘটনা ঘটছে। প্রাণহানির খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো উদ্বেগজনক। সব পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সহনশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে কঠোর হস্তে।

আমরা চাই সর্বোতভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী নির্বাচিত সরকার গঠিত হবে-এই আমাদের প্রত্যাশা।

আর এটা চাই এই কারণে যে নির্বাচিত সরকারকে অনেক জঞ্জাল সরাতে হবে। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পনেরো বছরে ক্ষতি যা হওয়ার তো হয়েছেই, গত সতেরো মাসে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো চেপেছে অবক্ষয়ের বোঝা। সবচেয়ে বেশি হয়েছে কালচারাল ড্যামেজ। রাজনৈতিক তরুণদের কারও কারও ভাষায় অশ্লীলতা বাসা বেঁধেছে নিদারুণভাবে।

দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হীনবল। শিক্ষক পেটানো একশ্রেণির শিক্ষার্থীর কাছে অতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সাহিত্য-সংস্কৃতি আক্রান্ত। খেলাধুলার অঙ্গনটি নিরাপদ নয়। ক্রিকেটের অগ্রসরমানতাও রুখে দেওয়া হলো। এগুলো সংশোধনের জন্য দরকার স্থিরতা, দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতা। একটি শক্তিশালী সরকারই কেবল জাতিকে উদ্ধার করতে পারে এই অবক্ষয়ের গহ্বর থেকে।

-সাইমুন